পৃথিবীর অন্দরমহল
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ৬৩৭০ কিমি । অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্রের দূরত্ব ৬৩৭০ কিমি । দক্ষিণ আফ্রিকায় পৃথিবীর গভীরতম খনির গভীরতা ৩ - ৪ কিমি ।
জানা গেছে প্রতি ৩৩ মি গভীরতায় প্রায় ১° সেন্টিগ্রেট করে পৃথিবীর অভ্যন্তরে তাপমাত্রা বাড়ে ।
পৃথিবীর গভীরে কি আছে জানার জন্য খনি ছাড়াও উত্তর পশ্চিম রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপের ১২ কিমি গভীর গর্তটি হল পৃথিবীর গভীরতম কৃত্রিম গর্ত ।
পৃথিবীর রহস্য
পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে । তখন পৃথিবী ছিল প্রচন্ড উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড । সময়ের সাথে সাথে উপরিপৃষ্ঠটা আগে ঠান্ডা হয়ে শক্ত হয়ে গেছে । কিন্তু পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ এখনও বিরাট বড় অগ্নিকুণ্ড হয়ে আছে ।
ম্যাগমা কী ?
ভূগর্ভের পদার্থ প্রচন্ড চাপ ও তাপে গ্যাস, বাষ্প মিশ্রিত হয়ে গলিত অবস্থায় থাকলে তাকে ম্যাগমা বলে ।
লাভা কী ?
ভূগর্ভের গলিত উত্তপ্ত অর্ধতরল ম্যাগমা ফাটল দিয়ে ভূপৃষ্ঠের বাইরে বেরিয়ে এলে তাকে লাভা বলে ।
উষ্ণ প্রস্রবণ কী ?
পৃথিবীর ভৌম জল ( পৃথিবীর ভেতরকার জল ) ভূ-তাপের ( পৃথিবীর ভেতরকার তাপ ) সংস্পর্শে এসে গরম হয়ে ফুটতে শুরু করে । পৃথিবীপৃষ্ঠের হাঁটুলের মধ্য দিয়ে সেই উষ্ণ জল বাইরে বেরিয়ে আসে একে বলে উষ্ণ প্রস্রবণ ।
ভূ-তাপ কী ?
ভূ-তাপ হল এক ধরনের শক্তি । পৃথিবীর কেন্দ্রের তাপ ধীরে ধীরে বাইরের দিকে অর্থাৎ পৃথিবীপৃষ্ঠের দিকে আসতে থাকে । এই তাপ শক্তিকে ভূ-তাপ বলে ।
পৃথিবীর ঘনত্ব
ভূপৃষ্ঠের গড় ঘনত্ব মাত্র ২.৬ থেকে ৩.৩ গ্রাম / ঘন সেমি । পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছে পদার্থের গড় ঘনত্ব প্রায় ১১ গ্রাম / ঘন সেমি । সেটা বেড়ে পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রে প্রায় ১৩ - ১৪ গ্রাম / ঘন সেমি হয় । কিন্তু কৃত্রিম উপগ্রহের বিচারে সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর গড় ঘনত্ব ৫.৫ গ্ৰাম / ঘন সেমি ।
ঘনত্ব ( Density ) কী ?
একক আয়তনে পদার্থের কতটুকু ভর আছে তার পরিমাপকে পদার্থের ঘনত্ব বলে । প্রতি ঘন সেমি জায়গায় পদার্থের ভর কতটা সেটাই পদার্থের ঘনত্ব ।
ভূমিকম্প তরঙ্গ
ভূমিকম্পের তরঙ্গের গতিবিধি লক্ষ্য করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছেন । তরঙ্গ গুলো বিভিন্ন ধরনের পদার্থের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় কখনো দীর্ঘ, কখনো ক্ষুদ্র আবার কখনো দ্রুত বা ধীর গতি সম্পন্ন হয় ।
স্বাভাবিক নিয়মে পৃথিবীর অভ্যন্তরে যত যাওয়া যায় তত পদার্থের চাপ বাড়ে । চাপ বাড়লে পদার্থের ঘনত্ব যেমন বেড়ে যায় তেমন বেশি ঘন পদার্থ চাপ দেয় বেশি । পৃথিবীর অভ্যন্তরে ক্রমশ চাপ ও তাপ বাড়ার ফলে ভেতরের পদার্থ গুলো কোথাও কঠিন, কোথাও তরল আবার কোথাও অর্ধতরল অবস্থায় আছে ।
পেঁয়াজের খোসা ছাড়ালে যেরকম স্তর বিন্যাস দেখা যায়, পৃথিবীর অন্দরমহল টা অনেকটা সেরকম বিভিন্ন ঘনত্বের ও বৈশিষ্ট্যের স্তরে বিভক্ত ।
বর্তমানে পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে জানতে ভূমিকম্প তরঙ্গের গতিবিধি খুব সাহায্য করেছে । ভূমিকম্প তরঙ্গ ও আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে বেরোনো লাভা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রধানত তিনটি স্তরের সন্ধান পেয়েছেন । একেবারে ওপরে আছে ভূত্বক । ভূত্বকের নীচে আছে গুরুমন্ডল । আর একেবারে নীচে বা পৃথিবীর কেন্দ্রের অবস্থান করছে কেন্দ্র মন্ডল ।
ভূত্বক
মহাসাগরের নিচে ভূত্বক গড়ে ৫ কিমি ও মহাদেশের নিচে গড়ে ৬০ কিমি গভীর । এর গড় গভীরতা প্রায় ৩০ কিমি ।
সিমা ( SIMA ) কী ?
মহাসাগরের নিচে প্রধানত সিলিকন ( SI ) আর ম্যাগনেসিয়াম (MG ) দিয়ে তৈরি হলো সীমা । এই স্তর তুলনা ভারী । প্রধানত ব্যাসল্ট জাতীয় আগ্নেয় শিলা এই স্তর গঠন করেছে ।
সিয়াল ( SIAL ) কী ?
মহাদেশের নিচে প্রধানত সিলিকন ( SI ) আর অ্যালুমিনিয়াম (AI ) দিয়ে তৈরি ভূত্বকের ওপরে স্তরটি হল সিয়াল ( SIAL ) । গ্রানাইট জাতীয় আগ্নেয় শিলা এই স্তর গঠন করেছে । এই স্তর সিমার চেয়ে হালকা এবং একটানা নয় । সমুদ্রের নিচে এই স্তর অনুপস্থিত । সিমা বা মহাসাগরীয় ভূত্বকের ওপরে সিয়াল অবস্থান করছে ।
বিযুক্তি রেখা ( Discontinuity ) কী ?
ভূপৃষ্ঠ থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত যেখানে যেখানে ভূমিকম্পের তরঙ্গের গতিবেগ পরিবর্তন হয় সেখানে তাকে ভূতত্ত্ববিদরা বলেন বিযুক্তি রেখা ( Discontinuity ) । সিয়াল ও সিমা স্তরের মাঝে আছে কনরাড বিযুক্তি রেখা ।
গুরুমন্ডল
ভূত্বক ছাড়িয়ে পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রায় ২৯০০ কিমি পর্যন্ত একই ঘনত্ব যুক্ত স্তর হল গুরু মন্ডল ( Mantle ) । এই স্তরের উষ্ণতা ২০০০° সে - ৩০০০° সে । পদার্থের ঘনত্ব ৩.৪ - ৫.৬ গ্রাম / ঘন সেমি । এই স্তরের প্রধান উপাদান লোহা, নিকেল, ক্রোমিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও সিলিকন ।
ক্রোফেসিমা স্তর কী ?
গুরুমন্ডলের ৩০ - ৭০০ কিমি পর্যন্ত অংশ ক্রোমিয়াম (Cr,) লোহা (Fe), সিলিকন (Si) ও ম্যাগনেসিয়াম (Mg) প্রাধান্য দেখা যায় । এটি হলো ক্রোফেসিমা স্তর ।
নিফেসিমা স্তর কী ?
গুরুমন্ডলের ৭০০ - ২৯০০ কিমি পর্যন্ত অংশে নিকেল (Ni), লোহা (Fe), সিলিকন (Si), ও ম্যাগনেসিয়াম (Mg) আধিক্যের জন্য এই স্তর হলো নিফেসিমা ( Ni + Fe + Si + Ma )
ভূত্বক ও গুরুমন্ডলের মাঝে আছে মোহোরোভিসিক বিযুক্তি রেখা । ক্রোফেসিমা ও নিফেসিমার মাঝে আছে রেপিত্তি বিযুক্তিরেখা ।
ভূত্বক ও গুরুমন্ডলের উপরি অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছে শিলামন্ডল । এর গভীরতা প্রায় ১০০ কিমি ।
অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার স্তর কী ?
শিলা মন্ডলের নিচে গুরুমন্ডলের উপরের অংশে বিশেষ স্তরটি হলো অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার ( Asthenosphere ) । Asthenosphere একটি গ্রিক শব্দ, যার মানে দুর্বল স্তর । এই স্তরে পদার্থ গলিত ও নরম প্রকৃতির । অত্যধিক তাপ ও চাপে এখানকার শিলা সান্দ্র ( অর্ধ তরল অর্ধ কঠিন ) অবস্থায় আছে ।
কেন্দ্রমন্ডল
ভূত্বক ও গুরুমন্ডলের পরবর্তী এবং কেন্দ্রের চারিদিকে বেস্টনকারী শেষ স্তরটি হল কেন্দ্রমন্ডল ( Core )। এই স্তরটি প্রায় ৩৫০০ কিমি গভীর । অত্যন্ত ভারী নিকেল (Ni) আর লোহা (Fe) দিয়ে তৈরি বলে একে (Nife) 'নিফে' বলে । এর গড় তাপমাত্রা প্রায় ৫০০০° সেলসিয়াস । এই স্তরের গড় ঘনত্ব প্রায় ৯.১ থেকে ১৩.১ গ্রাম / ঘন সেমি । পদার্থের ঘনত্ব, উষ্ণতা, চাপ কেন্দ্র মন্ডলের সব জায়গায় একই রকম নয় । এগুলোর ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা কেন্দ্রমন্ডল কে দুটি অংশে বিভক্ত করেছেন -
(১) অন্তঃকেন্দ্রমন্ডল
এই স্তর পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রের চারিদিকে রয়েছে । এই স্তরের গভীরতা ৫১০০ কিমি থেকে প্রায় ৬৩৭০ কিমি । এই স্তরের চাপ, তাপ, ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি । অত দেখ চাপের ফলে পদার্থগুলো এখানে কঠিন অবস্থায় আছে ।
(২) বহিঃ কেন্দ্র মন্ডল
অন্তঃকেন্দ্র মণ্ডলের চারিদিকে রয়েছে বহিঃ কেন্দ্র মন্ডল । এই স্তর ২৯০০ কিমি - ৫১০০ কিমি গভীর । এর চাপ, তাপ ও ঘনত্ব অন্তঃকেন্দ্রমন্ডলের তুলনায় কম । এই স্তর অর্ধ কঠিন অবস্থায় পৃথিবীর অক্ষরে চারদিকে আবর্তন করে চলেছে । এই স্তরে সান্দ্র অবস্থায় থাকা লোহা ও নিকেল প্রচন্ড গতিতে ঘুরতে ঘুরতে বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যেখান থেকেই সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর চৌম্বকত্ব ।
গুরুমন্ডল ও কেন্দ্রমন্ডলের মাঝে আছে গুটেনবার্গ বিযুক্তি রেখা ।
কেন্দ্র মন্ডলের ভিতরের স্তর অন্তঃকেন্দ্রমন্ডল ও বাইরের স্তর বহিঃ কেন্দ্রমন্ডল এর মাঝে রয়েছে লেহম্যান বিযুক্তি রেখা।

