ধ্বনি পরিবর্তন: সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও সহজ উদাহরণ | গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্ত

 ধ্বনি পরিবর্তন 

আমরা অনেকেই অনেক কথার মূল উচ্চারণকে একটু বদলে নিয়ে বলে থাকি । যেমন 'স্কুল' কে 'ইস্কুল', 'গ্লাস' কে 'গেলাস' ইত্যাদি । তেমন একটি শব্দ হল 'বিলাতি', একে আমরা 'বিলিতি' বলি । আমরা জানি 'ই' এবং 'আ' এই ধ্বনি গুলি উচ্চারণের সময়ে জিভ যথাক্রমে উপরে আর নিচে থাকে । এখন বিলাতি বলার সময় জিভকে ই-আ-ই কে উচ্চ-নিম্ন-উচ্চ অবস্থানে যেতে হয় । এই পরিশ্রম বাঁচাতে 'বিলিতি' বললে জিভের খাটনি সবচেয়ে কম হয় । তাই বলা যেতে পারে ধ্বনি পরিবর্তনের মূল কারণ হল উচ্চারণের সরলীকরণের প্রতি বাগ যন্ত্রের সহজাত প্রবণতা । কঠিন উচ্চারণ কে এই ভাবেই শব্দের অন্তর্গত বিভিন্ন ধ্বনির পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা সহজ করে নিই । ব্যাকরণে ও ভাষা তত্ত্বে এই বিষয়টি কেই বলা হয় ধ্বনি পরিবর্তন । মনে রাখতে হবে ধ্বনি পরিবর্তনের পর্যায়টি আকস্মিক নয়, একটি ভাষা গোষ্ঠীর মানুষের উচ্চারণ প্রবণতার অনুসারী এবং দীর্ঘমেয়াদি । ভাষার বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে তার যোগ সুস্পষ্ট ।

ধ্বনি পরিবর্তন: সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও সহজ উদাহরণ | গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর


১. ধ্বনি পরিবর্তনের মূল কারণ কোনটি ? 

উঃ। ধনী পরিবর্তনের মূল কারণ হল উচ্চারণের সরলীকরণের প্রতি বাগ্ যন্ত্রের সহজাত প্রবণতা । শব্দের উচ্চারণ কে শব্দের অন্তর্গত বিভিন্ন ধ্বনির পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা সহজ করে নিই ।

২. ধ্বনি পরিবর্তন কাকে বলে ? 

উঃ। উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী শক্ত উচ্চারণ কে সহজ করার জন্য আমরা কাছাকাছি ধ্বনি গুলির সন্নিবেশ করে নিতে চাই  । এতে শব্দের অর্থ একই থাকলেও ধ্বনিতাত্ত্বিক দিক থেকে শব্দের বহিরঙ্গে নানা রূপান্তর ঘটে । ব্যাকরণে ও ভাষাতত্ত্বে এই বিষয়টিকে বলা হয় ধ্বনি পরিবর্তন ।

৩. ধ্বনি পরিবর্তনের কয়েকটি ধারা লক্ষ্য করা যায় ?

উঃ। ধ্বনি পরিবর্তনের মোট তিনটি ধারা দেখা যায় । (ক) ধ্বনির আগমন, (খ) ধ্বনি লোপ, (গ) ধ্বনির রূপান্তর।

ধ্বনির আগম

১. ধ্বনির আগমকে কয়টি ভাগে ভাগ করা যায় ?

উঃ। ধ্বনির আগমকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, (ক) স্বরাগম ও (খ) ব্যঞ্জনাগম ।

২. স্বরাগম কাকে বলে ? এটি কয় প্রকার ও কি কি?

উঃ। শব্দের আদি, মধ্যে বা অন্তে সংযুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে তার আগে, পরে বা মধ্যে একটি স্বরধ্বনির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে উচ্চারণ ক্লেশ হ্রাস করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় স্বরাগম । স্বরাগম তিন প্রকার হয়ে থাকে (ক) আদি স্বরাগম, (খ) মধ্য স্বরাগম, (গ) অন্ত্য স্বরাগম ।

৩. আদি স্বরাগম কাকে বলে? উদাহরণসহ লেখো ।

উঃ। শব্দের শুরুতেই যুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে উচ্চারণের সুবিধার্থে যুক্ত ব্যঞ্জন টির পূর্বে একটি সুবিধা জনক স্বরধ্বনির  আগম ঘটে । একেই বলা হয় আদি স্বরাগম যেমনঃ স্পর্ধা > আস্পর্ধা ।  স্টেশন > ইস্টেশন ইত্যাদি ।

৪. মধ্য স্বরাগম কাকে বলে ? উদাহরণসহ লেখো ।

উঃ। শব্দের মধ্যে যুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে উচ্চারণ প্রয়াস কমানোর খাতিরে, সরলীকরনের প্রয়াসে অথবা ছন্দের কারণে যুক্ত ব্যঞ্জন দুটির মধ্যে একটি স্বরধ্বনির অনুপ্রবেশ ঘটে শব্দের সৌকর্য তথা উৎকর্ষ বৃদ্ধির রীতিকে বলা হয় মধ্য স্বরাগম । যেমনঃ কর্ম >করম ।গ্রাম > গেরাম ।

৫. মধ্য স্বরাগম কে স্বরভক্তি বলা হয় কেন ?

উঃ। এই স্বরাগমে স্বরধ্বনির সহযোগে যুক্ত ব্যঞ্জনকে বিভক্তি বলা হয় বলে মধ্য স্বরাগমের অপর নাম 'স্বরভক্তি' 

৬. মধ্য স্বরাগমকে বিপ্রকর্ষ বলা হয় কেন ?

উঃ। এই প্রক্রিয়ায় শব্দের সৌকর্য তথা উৎকর্ষকে বিশেষ রূপে ও প্রকৃষ্টভাবে বর্ধিত করা যায় বলে এই প্রক্রিয়াকে 'বিপ্রকর্ষ' ও বলা হয়ে থাকে ।

৭. কোন কোন শব্দে স্বরভক্তি ও বিপ্রকর্ষের প্রবণতা দেখা যায় তা উদাহরণসহ বুঝিয়ে দাও ।

উঃ। সাধারণত যেসব শব্দে 'র', 'ল', 'ন' ও ম সংযুক্ত হয়ে যুক্ত ব্যঞ্জন তৈরি করছে স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষের বিশেষ প্রবণতা সেখানেই দেখা যায় । যে শব্দগুলির আগম তার মধ্যে পড়ে সেগুলি হলঃ অ,ই,উ,এ এবং ও ।

৮. অন্ত্য স্বরাগম কাকে বলে ? উদাহরণ সহ লেখো ।

উঃ। শব্দের অন্তে যুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে উচ্চারণের শ্রম কমাতে ও উচ্চারণের আড়ষ্টতাকে সহজ করার জন্য অতিরিক্ত যে স্বরধ্বনির আগম ঘটে, তাকে বলা হয় অন্ত্য স্বরাগম। যেমনঃ দুষ্ট > দুষ্টু  । সত্য > সত্যি । বেঞ্চ > বেঞ্চি ইত্যাদি ।

৯. ব্যঞ্জনা গম বলতে কী বোঝ ?

উঃ। শব্দের মধ্যে অনেক সময় বাইরে থেকে একটি ব্যঞ্জনধ্বনি এসে জায়গা করে নেয়, একেই বলা হয় ব্যঞ্জনা গম । স্বরাগমের মতোই ব্যঞ্জনা গম ও আদি, মধ্য ও অন্ত্য, তিন স্থানেই হতে পারে । তবে বাংলা ভাষায় আদি ব্যঞ্জনাগম প্রায় দুর্লভ ।

১০. উদাহরণসহ আদি ব্যঞ্জনা গম সম্বন্ধে লেখো ।

উঃ। শব্দের আদি ও ব্যঞ্জন ধ্বনির আগম কদাচিৎ ঘটে । বাংলা ভাষার বিশেষ আঞ্চলিক বৈচিত্রেই এমন দেখা যায় । যেমনঃ আম > রাম ।

১১. মধ্য ব্যঞ্জনাগম কাকে বলে ? উদাহরণসহ লেখো।

উঃ। শব্দের মধ্যে যুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে, এমনকি না থাকলেও অনেক সময় একটি ব্যঞ্জনের আগম ঘটে । একেই মধ্য ব্যঞ্জনাগম  বলা হয় । যেমনঃ অম্ল > অম্বল । পোড়ামুখী > পোড়ারমুখী ইত্যাদি ।

১২. য়-শ্রুতি বলতে কী বোঝ ?

উঃ। দুটি স্বরধ্বনি পাশাপাশি থাকলে উচ্চারণের আড়ষ্টতা কাটাতে অনেক সময় একটি 'য়' ধ্বনির আগম ঘটে । একে য়-শ্রুতি বলে । যেমনঃ ছাআ > ছায়া । গোআলা > গোয়ালা ইত্যাদি ।

১৩. ব-শ্রুতি বলতে কী বোঝ ?

উঃ। দুটি স্বরধ্বনি পরস্পর সন্নিহিত থাকলে উচ্চারণের সুবিধার্থে অনেক সময় একটি অন্তঃস্থ ব ধ্বনির আগম ঘটে থাকে । একে বলা হয় ব-শ্রুতি । যেমনঃ শোআ > শোবা ( শোওয়া ) । ধোআ > ধোবা ( ধোওয়া ) ইত্যাদি ।

১৪. অন্ত ব্যঞ্জনাগম কাকে বলে ?

উঃ। শব্দের অন্তে যুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে কিংবা না থাকলেও অনেক সময় একটি ব্যঞ্জনধ্বনির আবির্ভাব ঘটে । একে অন্ত ব্যঞ্জনাগম বলা চলে । যেমনঃ ধনু > ধনুক । নানা > নানান । সীমা > সীমানা । জমি > জমিন ইত্যাদি ।

ধ্বনি লোপ

১. ধ্বনি লোপ কাকে বলে ? ধ্বনি লোপ কয় প্রকার ও কী কী ?

উঃ। উচ্চারণের ক্ষেত্রে অনেক সময় শব্দের অন্তর্গত বিশেষ বিশেষ কোনও ধ্বনির উপর বেশি জোর পড়ে । এর ফলে অন্য একটি ধ্বনি লুপ্ত হয় । এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ধ্বনি লোপ । ধ্বনি লোপ মূলত দু প্রকার, (ক) স্বরধ্বনি লোপ (খ) ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ।

২. স্বরলোপ কাকে বলে? এটি কয় প্রকার ও কী কী ?

উঃ। শব্দের অন্তর্গত কোনও স্বরধ্বনি লুপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকেই বলা হয় স্বরলোপ । লুপ্ত স্বরধ্বনিটির স্থানানুসারে  স্বরলোপ তিন প্রকার, (ক) আদি স্বরলোপ, (খ) মধ্য স্বরলোপ, (গ) অন্ত্য স্বরলোপ ।

৩. আদি স্বরলোপ কাকে বলে ? উদাহরণসহ লেখো ।

উঃ। শব্দের আদিতে অবস্থিত স্বরধ্বনিটি লুপ্ত হলে তাকে আদি স্বরলোপ বলা হয় । যেমনঃ অলাবু > অলাউ > লাউ । উদ্ধার > উধার > ধার । অভ্যন্তর > ভিতর ইত্যাদি।

৪. মধ্য স্বরলোপ কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।

উঃ। শব্দের মধ্যস্থিত স্বরধ্বনির লোপ পাওয়ার প্রক্রিয়ার নাম মধ্য স্বরলোপ বা সম্প্রকর্ষ । যেমন - বসতি > বস্তি ।

৫. মধ্য স্বরলোপ কে সম্প্রকর্ষ বলা হয় কেন ? এটি কার বিপরীত প্রক্রিয়া ? 

উঃ। এইভাবে শব্দের সৌকর্য  তথা উৎকর্ষ সম্যকভাবে ও প্রকৃষ্ট রূপে বাড়ানো সম্ভব বলে 'সম্প্রকর্ষ' নাম দেওয়া হয়েছে । এটি বিপ্রকর্ষের বিপরীত প্রক্রিয়া । যেমনঃ জানালা > জানলা । বসতি > বস্তি । ভগিনী > ভগ্নী । নাতিনী > নাতনী । নারিকেল > নারকেল ইত্যাদি।

৬. ধ্বনিলোপের কোন পদ্ধতি বাংলা ভাষার অন্যতম বিশিষ্ট ধ্বনিতাত্ত্বিক লক্ষণ ? উদাহরণসহ লেখ ।

উঃ। শব্দের শেষে থাকা স্বরধ্বনির লোপকেই বলা হয় অন্ত্য স্বরলোপ। বাংলা ভাষায় শব্দের অন্ত্য অ প্রায়শই লোপ পায়। বস্তুত, বাংলা ভাষার অন্যতম বিশিষ্ট ধ্বনিতাত্ত্বিক লক্ষণের মধ্যেই এটি পড়ে । আমরা লিখি 'জীবন' বলি 'জীবন্' । লিখি 'নর' বলার সময় হয়ে যায় 'নর্' । ভাষার বিবর্তনের ক্ষেত্রেও প্রক্রিয়াটি যে ক্রিয়াশীল তা দেখানো যায় । যেমনঃ হস্ত > হত্ত > হাত্। চন্দ্র > চান্দ > চাঁদ ইত্যাদি।

৭. অন্ত্য অ ছাড়া অন্য স্বরধ্বনির লুপ্ত হওয়ার দু একটি উদাহরণ দাও ।

উঃ। অন্ত্য অ ছাড়া অন্য স্বরধ্বনির ক্ষেত্রেও লুপ্ত হওয়ার ঘটনা ঘটতে দেখা যায় । যেমনঃ রাত্রি > রাতি > রাত্ । খানি > খান্ ইত্যাদি । এছাড়া, বাংলা সন্ধির ক্ষেত্রে অনেক সময় স্বরলোপ ঘটে । যেমনঃ কাঁচা + কলা = কাঁচকলা ।

৮. ব্যঞ্জনলোপ কাকে বলে? এটি কয় ভাগে বিভক্ত ও কী কী ?

উঃ। পদের আদি, মধ্য বা অন্তে অবস্থিত স্বরধ্বনিযুক্ত বা স্বরধ্বনিবিহীন কোনো ব্যঞ্জনধ্বনির লোপ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ব্যঞ্জনলোপ । ব্যঞ্জনলোপ তিনটি ভাগে বিভক্ত, (ক) আদি ব্যঞ্জনলোপ, (খ) মধ্য ব্যঞ্জনলোপ এবং (গ) অন্ত্য ব্যঞ্জনলোপ ।

৯. আদি ব্যঞ্জনলোপ কাকে বলে ? উদাহরণসহ লেখো ।

উঃ। শব্দের আদিতে থাকা ব্যঞ্জনধ্বনির লোপ পওয়ার পদ্ধতি কে বলা হয় আদি ব্যঞ্জনলোপ। যেমনঃ স্থান > থান । বই > উই । স্পর্শ > পরশ ইত্যাদি ।

১০. মধ্য ব্যঞ্জনলোপ কাকে বলে ? উদাহরণসহ লেখো।

উঃ। শব্দের মধ্যস্থিত ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পাওয়ার ঘটনাকে মধ্য ব্যঞ্জনলোপ বলা হয় । যেমনঃ ফাল্গুন > ফাগুন । অশ্বত্থ > অশথ । শৃগাল > শিয়াল । বেহাই > বেয়াই ।

১১. অন্ত ব্যঞ্জনলোপ কাকে বলে ? উদাহরণসহ লেখো ।

উঃ। শব্দের শেষে থাকা ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পেলে তাকে অন্ত ব্যঞ্জনলোপ বলা যায় । যেমনঃ গাত্র > গা । বড়দাদা > বড়দা । মেজদিদি > মেজদি । ছোটোদাদা > ছোড়দা । 

Riju Mondal — পাঠনেক্সা (Pathnexa)-এর লেখক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর। সহজ ভাষায় শিক্ষামূলক ও তথ্যভিত্তিক বিষয় পাঠকদের কাছে তুলে ধরাই আমার লক্ষ্য।

Related Posts