শিলা কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি ?
শিক্ষার্থীরা, আপনারা কি শিলা কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি ? সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান ? তাহলে এই পোষ্টে pathnexa.in ওয়েবসাইট এর পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য শিলা কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি ? বিষয় সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর তুলে ধরা হয়েছে ।
শিলা কাকে বলে ?
উঃ। পৃথিবী যে শক্ত আবরণে ঢাকা তা হলো শিলা । শিলা আসলে প্রকৃতিতে প্রাপ্ত এক বা একাধিক খনিজের সমসত্ত্ব বা অসমসত্ত্ব মিশ্রণ । আর যে খনিজ দিয়ে শিলা গঠিত তা হলো এক বা একাধিক অজৈব মৌলিক পদার্থের যৌগ । যেমনঃ গ্রানাইট শিলা কোয়ার্টজ, ফেল্ডসপার, মাইকা ও হর্নব্লেন্ড খনিজ দ্বারা গঠিত । আবার চুনাপাথর শুধুমাত্র ক্যালসাইট অথবা অ্যারাগোনাইট খনিজ দিয়ে গঠিত ।
শিলা কয় প্রকার ও কী কী ?
উঃ। প্রকৃতিতে বিভিন্ন ধরনের শিলা দেখতে পাওয়া যায় । এদের সৃষ্টি আর বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে শিলাকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায় - (১) আগ্নেয় শিলা, (২) পাললিক শিলা ও (৩) রূপান্তরিত শিলা ।
আগ্নেয় শিলা কাকে বলে ?
উঃ। পৃথিবী সৃষ্টির সময় উত্তপ্ত ও তরল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে ভূত্বকের মধ্যে ও ওপরে প্রথম যে কঠিন শিলার সৃষ্টি হয় সেটি আগ্নেয় শিলা ।
পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্টি হওয়ায় এই শিলার আরেক নাম প্রাথমিক শিলা । ভূ অভ্যন্তরের বিভিন্ন ধাতব পদার্থ যেমন - সিলিকন, লোহা, নিকেল, ম্যাগনেসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি উত্তপ্ত ও গলিত অবস্থায় ম্যাগমা রূপে থাকে । এই ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরের প্রবল চাপে লাভা রূপে ভূপৃষ্ঠে উঠে এসে বা ভূ-অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি করে ।
আগ্নেয় শিলার শ্রেণীবিভাগ
উঃ। উৎপত্তি অনুসারে আগ্নেয়শিলা দু'রকম নিঃসারী আগ্নেয় শিলা ও উদবেধী আগ্নেয় শিলা।
নিঃসারী আগ্নেয় শিলা কাকে বলে ?
উঃ। ভূ অভ্যন্তরের অত্যাধিক চাপে উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা ভূত্বকের কোনো দুর্বল ফাটলের মধ্যে দিয়ে ভূপৃষ্ঠে লাভা রূপে এসে শীতল ও কঠিন হয়ে যে আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি করে তার নাম নিঃসারী আগ্নেয় শিলা । খুব দ্রুত জমাট বেঁধে গঠিত হয় বলে এর দানাগুলো বেশ সূক্ষ্ম হয় যেমন - ব্যাসল্ট, অবসিডিয়ান ।
উদবেধী আগ্নেয় শিলা কাকে বলে ?
উঃ। ভু অভ্যন্তরের গলিত ম্যাগমা ভূত্বকের দুর্বল ফাটল বা ছিদ্রের মধ্যে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছোতে না পেরে ভূ-অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে উদবেধী আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি করে । যেমনঃ গ্রানাইট, ডোলেরাইট ।
উদবেধী আগ্নেয় শিলার শ্রেণীবিভাগ ?
উঃ। এই উদ্ বেধী আগ্নেয় শিলা আবার দুই রকমের হয় । যথা- উপ পাতালিক শিলা ও পাতালিক শিলা ।
উপ পাতালিক শিলা কাকে বলে ?
উঃ। ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরের কোনো ফাটল বা ছিদ্রপথে ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে সৃষ্টি হয় উপপাতালিক শিলা। যেমনঃ ডোলেরাইট ।
পাতালিক শিলা কাকে বলে ?
উঃ। আবার ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরের এক্কেবারে তলদেশে অতি ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে সৃষ্টি করে পাতালিক শিলা । ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বাঁধে বলে এই শিলার দানাগুলো কিছুটা স্থূল হয়। যেমনঃ গ্রানাইট ।
আগ্নেয় শিলার বিশেষত্ব
- এই শিলা শক্ত ও ভারী, ঘনত্ব খুব বেশি ।
- কেলাসের মতো গঠন দেখা যায় ।
- এই শিলায় উল্লম্ব দারণ ও ফাটল দেখা যায়, তাই প্রবেশ্যতা বেশি ।
- ভঙ্কুরতা যথেষ্ট কম হওয়ায় ক্ষয় প্রতিরোধের ক্ষমতা বেশি ।
গ্ৰানাইট শিলা কাকে বলে ?
উঃ। প্রধানত এই আগ্নেয় শিলায় মহাদেশীয় ভূত্বক তৈরি । হালকা সাদা, ধূসর থেকে গোলাপি রঙের এই শিলা কোয়ার্টজ, ফেল্ডসপার, মাইকা ও হর্নব্লেন্ড খনিজ দ্বারা গঠিত । এই শিলা অপ্রবেশ্য । খুব ভারী এবং শক্ত হওয়ায় গ্রানাইটের ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব বেশি । ভূ অভ্যন্তরে অতি ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বাধায় এই শিলার দানাগুলো কিছুটা বড়ো ( ব্যাস ৩ মিমি এর বেশি ) । গ্রানাইট শিলায় গঠিত অঞ্চলের ভূমিরূপ সাধারণত গোলাকার হয় ।
ব্যাসল্ট শিলা কাকে বলে ?
উঃ। প্রধানত এই আগ্নেয় শিলায় মহাসাগরীয় ভূত্বক গঠিত । খুব ভারী ও শক্ত ক্ষয় প্রতিরোধী এই শিলা গাঢ় ধূসর থেকে কালো রঙের হয় । ব্যাসল্ট গঠনকারী প্রধান খনিজ গুলি হলো কোয়ার্টজ, ফেল্ডসপার, অলিভিন ও পাইরক্সিন । ব্যাসল্ট শিলায় উল্লম্ব দারণ ও ফাটলের সংখ্যা খুব বেশি থাকায় এর প্রবেশ্যতা যথেষ্ট বেশি । খুব দ্রুত জমাট বেঁধে গঠিত হওয়ায় এর দানা গুলো বেশ সূক্ষ্ম ( ব্যাস ১ মিমি এর কম ) । ব্যাসল্ট শিলা গঠিত অঞ্চলে চ্যাপ্টা আকৃতির ভূমিরূপ দেখা যায় ।
পাললিক শিলা কাকে বলে ?
উঃ। আগ্নেয় শিলা বহুদিন ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ক্ষয়কারী শক্তি যেমন - নদী, হিমবাহ, বায়ু, সমুদ্র তরঙ্গ প্রভৃতির প্রভাবে উৎস স্থান থেকে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত ও পরিবাহিত হয়ে কোনো সমুদ্র, হ্রদ বা নদীর তলদেশে জমা হতে থাকে । এভাবে বছরের পর বছর ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থ গুলো স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয় এবং চাপের ফলে জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে পাললিক শিলার সৃষ্টি করে । এই শিলার মধ্যে বালি, পলি ও কাদার ভাগ বেশি থাকে । পলি জমাট বেঁধে সৃষ্টি হওয়ায় এর নাম পাললিক শিলা । যেমনঃ চুনাপাথর, বেলেপাথর, কাদা পাথর ।
পাললিক শিলার শ্রেণীবিভাগ
উঃ। পলির উৎপত্তি অনুসারে পাললিক শিলা দুই প্রকার যথাঃ সংঘাত শিলা ও অসংঘাত শিলা ।
যান্ত্রিক উপায়ে গঠিত পাললিক শিলা তিন প্রকার । যাঃ কাদা পাথর , বেলে পাথর ও কংগ্লোমারেট ।
পাললিক শিলার বিশেষত্ব
- এই শিলায় স্তরায়ণ এবং কাদার চিড় খাওয়া দাগ লক্ষ্য করা যায় ।
- একমাত্র এই শিলাতেই জীবাশ্ম দেখা যায় ।
- এই শিলায় সছিদ্রতা ও ভঙ্গুরতা দেখা যায় ।
- এই শিলায় প্রবেশ্যতা খুব বেশি ।
- ক্ষয় প্রতিরোধের ক্ষমতা বিভিন্ন রকম হয় ।
- কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার এই শিলা ।
- কাঠিন্য আগ্নেয় শিলার থেকে কম ; দারণ, ফাটল বা কেলাসের গঠন থাকে না ।
জীবাশ্ম কাকে বলে ?
উঃ। স্তরে স্তরে জমাট বেঁধে পাললিক শিলা সৃষ্টির সময় কখনো কখনো সামুদ্রিক উদ্ভিদ বা প্রাণী তার মধ্যে চাপা পড়ে যায় । পরে পাললিক শিলার মধ্যে ওই উদ্ভিদ বা প্রাণীর দেহ প্রস্তুরীভূত হলে তাদের দেহাবশেষের ছাপ থেকে যায় একে বলে জীবাশ্ম । 'অশ্ব' কথার অর্থ হলো পাথর ।
সংঘাত শিলা কাকে বলে ?
উঃ। প্রাচীন শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বহুদিন ধরে জমাট বেঁধে যে শিলার সৃষ্টি করে তা হল সংঘাতশিলা । যেমন ঃ কংগ্লোমারেট, ব্রেকসিয়া ।
অসংঘাত শিলা কাকে বলে ?
উঃ। রাসায়নিক উপায়ে অথবা জৈবিক উপায়ে সৃষ্ট শিলা হলো অসংঘাত শিলা । যেমনঃ চুনাপাথর, লবণ শিলা ।
রূপান্তরিত শিলা কাকে বলে ?
উঃ। আগ্নেয় ও পাললিক শিলা ভূ-অভ্যন্তরের প্রচন্ড চাপ, তাপ, নানার রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে তার পুরোনো ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম হারিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্ম বিশিষ্ট শিলায় পরিণত হয় । একেই বলে রূপান্তরিত শিলা ।
অনেক ভাবেই শিলার রূপান্তর হতে পারে । যথাঃ (১) অত্যাধিক তাপে ( পিট কয়লা থেকে গ্রাফাইট ), (২) প্রচন্ড চাপে ( শেল থেকে স্লেট ), (৩) রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ( অ্যান্ডালুসাইট থেকে সিলিমেনাইট ) ।
